বিংশ শতকের শুরুর দিকে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জমিদারি দেখাশোনার দায়িত্ব নিয়ে নওগাঁ জেলার পতিসরে আসেন। সেই সময়ের জীবনযাত্রা জোড়াসাঁকোর ঐশ্বর্যের মতো নয়, বরং ছিল কঠোর সংগ্রামের। এখানে এসে রবীন্দ্রনাথ দেখলেন গ্রামের কৃষকদের নিত্যদিনের জীবন সংগ্রাম। সুদখোর মহাজনদের অত্যাচারে তারা নিঃস্ব হয়ে পড়ছে। এই অভিজ্ঞতা তাঁর মনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে, এবং তিনি তাদের জীবনযাত্রার উন্নতির জন্য ভাবতে শুরু করেন।
সেই সময়ে ভারতে আধুনিক ব্যাঙ্কিং সিস্টেম তেমন প্রচলিত ছিল না। রবীন্দ্রনাথ প্রথমে সমস্যার সমাধান খুঁজে পাননি। পরে তিনি বুঝতে পারলেন, ব্যাঙ্কের মাধ্যমে কৃষকদের সহায়তা করা যেতে পারে। তাই ১৯০৫ সালে তিনি পতিসরের কালীগ্রামে ভারতের প্রথম কৃষিব্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠা করেন। সেই ব্যাঙ্ক কৃষকদের কম সুদে ঋণ দিত, যা তাদের জীবনযাত্রা উন্নত করতে সহায়তা করত। প্রথমদিকে কৃষকরা বিষয়টি বুঝতে না পারলেও, ধীরে ধীরে তারা এই ব্যবস্থার প্রতি আস্থা রাখতে শুরু করে।
১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের কারণে সারা বাংলা উত্তাল ছিল। শহর কলকাতায় স্বদেশি আন্দোলনের জোয়ার উঠেছিল। রবীন্দ্রনাথ সেই সময়ে পদ্মার পাড়ে এসে কৃষকদের পাশে দাঁড়ান। তিনি শুধু কৃষিব্যাঙ্কই প্রতিষ্ঠা করেননি, বরং একটি হাইস্কুল এবং একটি দাতব্য চিকিৎসালয়ও গড়ে তোলেন। যদিও প্রথম দিকে কৃষিব্যাঙ্কের জন্য লগ্নি জোগাড় করা কঠিন ছিল, তবু তিনি দমে যাননি। পরে অবশ্য অর্থকষ্ট কাটিয়ে উঠতে নোবেল পুরস্কারের অর্থ তিনি এই কাজেই ব্যয় করেন।
১৯১৩ সালে রবীন্দ্রনাথ যখন নোবেল পুরস্কার পেলেন, তখন সেই পুরস্কারের ১ লক্ষ ৮ হাজার টাকা তিনি পতিসরের কৃষিব্যাঙ্কে লগ্নি করেন। এই অর্থ দিয়ে কৃষকদের পাশে দাঁড়ান তিনি। বাকি অর্থ দিয়ে বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠার কাজে সাহায্য করেন। তবে দুঃখজনকভাবে, এই কৃষিব্যাঙ্ক শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে পারেনি এবং দেউলিয়া হয়ে যায়। রবীন্দ্রনাথ লগ্নির টাকাও ফেরত পাননি। তবে তিনি বাকি আমানতকারীদের টাকা যতটা সম্ভব ফেরত দেওয়ার চেষ্টা করেন।
রবীন্দ্রনাথ হয়তো জমিদার পরিবারের সন্তান হিসেবে সারা জীবন আরাম-আয়েশে কাটাতে পারতেন, কিন্তু তিনি সেই জীবন বেছে নেননি। বরং, তিনি দরিদ্র মানুষের দুঃখ-কষ্টের সঙ্গী হয়ে উঠেছিলেন। বিশ্বভারতীর জন্য অর্থ সংগ্রহ করতেও তিনি নাটকের দল নিয়ে সারা দেশ ঘুরেছেন এবং বিদেশেও গিয়েছেন। তাঁর অনেক উদ্যোগ হয়তো সফল হয়নি, কিন্তু দেশের অর্থনীতির জন্য তাঁর বিকল্প চিন্তার গুরুত্বকে অস্বীকার করা সম্ভব নয়।