বিধানচন্দ্র রায় ছিলেন এক অসাধারণ চিকিৎসক, যাঁর দক্ষতা এবং ক্লিনিক্যাল অভিজ্ঞতা ছিল অভাবনীয়। তিনি বাংলার দ্বিতীয় মুখ্যমন্ত্রী এবং এক সময় কলকাতার মহানাগরিক ছিলেন। এমআরসিপি ও এফআরসিএস-এর ডিগ্রি নিয়ে বিদেশ থেকে ফিরে আসা এই মহান ব্যক্তি কেবল বাঙালির হৃদয়ে এক চিকিৎসক নয়, বরং এক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে আজও স্মরণীয়। তবে তাঁর জীবনের আরও একটি গল্প, যা বাঙালির কল্পনায় চিরকাল জায়গা করে নিয়েছে, তা হলো তাঁর অপ্রাপ্তির প্রেমকাহিনি।
বাঙালিরা প্রায়ই অপ্রাপ্তির গল্পে আকৃষ্ট হয়। মনে করা হয়, দুঃখের কাহিনি আমাদের হৃদয়ের অনেক কাছাকাছি থাকে, এবং বিধান রায়ের প্রেমকাহিনি তার ব্যতিক্রম নয়। কল্পিত এই কাহিনিতে বিধান রায়ের প্রেমিকা কল্যাণী, যাঁর প্রতি তাঁর গভীর আনুগত্যের কথা বারবার বলা হয়েছে। এই গল্পটি বাঙালির মুখে-মুখে প্রচারিত হয়েছে যুগের পর যুগ, এবং তা নানা মাধ্যম যেমন টিভি, রেডিও, ইন্টারনেট ইত্যাদিতে স্থান পেয়েছে।
এই গল্পের কেন্দ্রে থাকেন নীলরতন সরকার, যিনি কল্পনায় একজন রাগী পিতার ভূমিকায়। কিন্তু বাস্তবে, এই কাহিনির কোনো ভিত্তি নেই। নীলরতন সরকারের কন্যা কল্যাণীর সঙ্গে বিধান রায়ের প্রেমকাহিনি একটি মিথ্যে প্রচার, যা বাস্তবে কখনও ঘটেনি। নীলরতন সরকারের পাঁচ কন্যা ছিলেন—নলিনী বসু, অরুন্ধতী চ্যাটার্জি, শান্তা সেন, মীরা সেন এবং কমলা চ্যাটার্জি—তবে তাঁদের মধ্যে কেউই কল্যাণী নামক কেউ ছিলেন না। এছাড়া, বিধান রায়ের সঙ্গে নীলরতন সরকারের সম্পর্কও বরাবরই ভালো ছিল, এবং বিধান রায় তাঁর চিকিৎসাও করতেন।
তাহলে কল্যাণী নামটি কীভাবে এল? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়, কলকাতার কাছে মার্কিন সেনাবাহিনীর জন্য একটি ঘাঁটি নির্মিত হয়েছিল, যা পরে কল্যাণী নামে পরিচিতি পায়। বিধান রায়ের পরিকল্পনায় এই স্থানটি একটি সুপরিকল্পিত শহরে রূপান্তরিত হয়, যার নামকরণ করা হয় কল্যাণী। সম্ভবত এখান থেকেই “কল্যাণী” নামটি একটি কল্পিত প্রেমকাহিনির সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে।
অনেকে মনে করেন যে বিধান রায় প্রেমে ব্যর্থতার জন্য বিয়ে করেননি। তবে, বিধান রায়ের নিজের কথায়, তাঁর আসল ভালোবাসা ছিল তাঁর কাজ। তিনি একবার বলেছিলেন, “কাজের সঙ্গেই আমার বিয়ে হয়েছে।” এই ভাবেই আমরা তাঁর অকৃতদার জীবনকে মশলাদার গল্পে রূপান্তরিত করেছি।
আজও বাঙালি সমাজে এই মিথ্যে কাহিনি বেঁচে আছে, এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম এটি সত্যি ভেবে এসেছে। কিন্তু বাস্তবে এটি কেবল একটি মিথ্যে প্রচার, যা কালের ধারায় একটি মিথ্যে কিংবদন্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।