গজা গ্রামের ঐতিহ্যবাহী নোয়া শিল্প: সংকট ও সম্ভাবনা

Sep 14 Bengal

“নোয়া” শব্দটি বাঙালি সংস্কৃতির একটি অংশ, যা বিশেষ করে বিবাহিত নারীদের শোভা বাড়ানোর জন্য ব্যবহৃত হয়। এই নোয়া শুধু একটি অলঙ্কার নয়, এটি সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক গুরুত্ব বহন করে। হাওড়ার গজা গ্রামের নোয়া শিল্পকে কেন্দ্র করে একটি সমৃদ্ধ ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে স্থানীয় শিল্পীরা সযত্নে লালন করে আসছেন।

নোয়া তৈরির প্রক্রিয়া খুবই শ্রমসাধ্য। গ্রামের বাড়িগুলোতে আলাদা করে কোনও কারখানা নেই, ঘরেই বসে পরিবারের সকলে মিলে নোয়া তৈরি করা হয়। পুরুষদের পাশাপাশি মহিলারাও সমানভাবে এই কাজের সঙ্গে যুক্ত। ছোট ছোট গোলাকার অ্যালুমিনিয়াম বা লোহার তার নিয়ে সেগুলি নিখুঁতভাবে বেঁকে নোয়ার আকার দেওয়া হয়। এরপর তা বিভিন্ন আকৃতি ও ডিজাইন অনুযায়ী প্রস্তুত করা হয়। প্রতিটি নোয়ার তৈরি হতে প্রায় কয়েক ঘণ্টা সময় লাগে, এবং তা সম্পূর্ণ হাতে তৈরি হওয়ার কারণে এর প্রতিটি পিস অনন্য।

এই গ্রামে নোয়ার তৈরি শুধু জীবিকার মাধ্যম নয়, এটি স্থানীয় সমাজ ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রতি বছর কুম্ভমেলা, গঙ্গাসাগর মেলা, এবং অন্যান্য বড় বড় মেলায় গজা গ্রামের নোয়া শিল্পীরা তাদের তৈরি নোয়া বিক্রি করেন। ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে এবং এমনকি দেশের বাইরেও এই নোয়ার চাহিদা রয়েছে। তবে, শিল্পীরা বলেন যে তাদের পরিশ্রমের সঠিক মূল্য পাচ্ছেন না। এই শিল্পটিকে আরও প্রসারিত এবং রক্ষা করতে সরকারি উদ্যোগ অত্যন্ত প্রয়োজন।

বর্তমানে, গ্রামের অনেক পরিবার অর্থনৈতিক দিক থেকে পিছিয়ে পড়েছে। বিশেষ করে বন্যার কারণে ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন অনেকেই। দামোদর নদীর তীরে অবস্থিত হওয়ার কারণে বর্ষাকালে গ্রামের অনেক অংশ জলের তলায় চলে যায়, যার ফলে শিল্পের কাজেও বিঘ্ন ঘটে। এই অবস্থার মধ্যে নোয়া শিল্পীদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে সরকারি সাহায্যের প্রয়োজন। এছাড়া, নোয়ার জন্য কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় অনেক পরিবারই এই শিল্প থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।

গজা গ্রামের নোয়া শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে শিক্ষিত যুবকদেরও এগিয়ে আসার প্রয়োজন। আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে এই শিল্পকে নতুন দিগন্তে নিয়ে যাওয়া যেতে পারে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নোয়ার বিক্রির ব্যবস্থা করলে এর চাহিদা আরও বাড়তে পারে এবং শিল্পীরা তাদের পরিশ্রমের সঠিক মূল্য পেতে পারেন।

গজা গ্রামের নোয়া শিল্প ভারতীয় হস্তশিল্পের অন্যতম মূল্যবান সম্পদ। এর রূপ, সৌন্দর্য এবং ঐতিহ্য আমাদের সাংস্কৃতিক গৌরবের অংশ। তাই এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখা এবং শিল্পীদের যথাযথ মর্যাদা ও সুরক্ষা প্রদান করা আমাদের সকলের দায়িত্ব।”