
মুম্বইয়ে টাইগার শ্রফের গাড়িতে গুলিবর্ষণের ঘটনায় উঠে এল নতুন তথ্য। ঘটনাস্থল থেকে পাঁচটি খালি খোল ও দুটি তাজা কার্তুজ উদ্ধারের পর হামলাকারীর অস্ত্রে যান্ত্রিক ত্রুটির সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। রাজস্থানের কোটা থেকে গ্রেফতার তিন সন্দেহভাজন।
মুম্বই, ১৯ অক্টোবর: বলিউড অভিনেতা টাইগার শ্রফের গাড়ি লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণের ঘটনায় তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই সামনে আসছে নতুন তথ্য। রবিবার সন্ধ্যায় মুম্বইয়ের জুহুতে ঘটে যাওয়া এই হামলায় অভিনেতা প্রাণে বেঁচে গেলেও তাঁর গাড়ির চালক এবং আরও এক ব্যক্তি আহত হন। এবার ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া কার্তুজ ও সিসিটিভি ফুটেজের সূত্র ধরে পুলিশের অনুমান, হামলাকারীদের একজনের আগ্নেয়াস্ত্রে যান্ত্রিক সমস্যা দেখা দিয়েছিল। সেই কারণেই হয়তো আরও ভয়াবহ পরিণতি এড়ানো সম্ভব হয়েছে।
ঘটনাস্থল পরীক্ষা করে তদন্তকারী দল সাতটি কার্তুজ-সংক্রান্ত আলামত পেয়েছে বলে খবর। এর মধ্যে পাঁচটি ব্যবহৃত কার্তুজের খোল এবং দুটি অক্ষত কার্তুজ রয়েছে। উদ্ধার হওয়া গুলি ৭.৬২ মিলিমিটার ক্যালিবারের বলে প্রাথমিকভাবে জানা গিয়েছে।
সাধারণত গুলি চালানোর সময় অস্ত্রের ভিতরের কার্তুজ ব্যবহৃত হওয়ার পর তার খোল বেরিয়ে আসে। কিন্তু কোনও কারণে আগ্নেয়াস্ত্রের কার্যপ্রণালী ব্যাহত হলে অব্যবহৃত কার্তুজও বাইরে বেরিয়ে আসতে পারে। তদন্তকারীদের সন্দেহ, জুহুর ঘটনায় এমনই কিছু ঘটে থাকতে পারে।
হামলায় ব্যবহৃত বন্দুকের ধরন শনাক্ত করার কাজও চলছে। বিশেষ করে জিগানা পিস্তল ব্যবহার করা হয়েছিল কি না, তা ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করছেন তদন্তকারীরা। যদিও অস্ত্র বিকল হওয়ার প্রকৃত কারণ এখনও চূড়ান্তভাবে জানা যায়নি।
হামলার সময়ের একটি ভিডিও তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, একটি গাড়ির পাশে এসে দুই ব্যক্তি আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করার চেষ্টা করছে। তাদের মধ্যে একজন পরপর গুলি চালালেও অন্যজনকে নিজের বন্দুক নিয়ে সমস্যায় পড়তে দেখা যায়।
দ্বিতীয় ব্যক্তিটি বারবার অস্ত্রটি সচল করার চেষ্টা করে। এমনকি হাত বদল করেও বন্দুক চালানোর চেষ্টা করতে দেখা যায় তাকে। কিন্তু প্রকাশ্যে আসা ভিডিওতে তার অস্ত্র থেকে গুলি বেরোনোর বিষয়টি স্পষ্ট নয়।
এই দৃশ্যের সঙ্গে ঘটনাস্থলে অব্যবহৃত কার্তুজ উদ্ধারের তথ্য মিলিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। তবে শুধুমাত্র ভিডিও দেখে বন্দুক জ্যাম হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
রবিবার, ১৮ অক্টোবর সন্ধ্যায় জুহুর পুষ্পা পার্ক সংলগ্ন এলাকা থেকে গাড়িতে চড়ে বেরোচ্ছিলেন টাইগার শ্রফ। সেই সময় মোটরসাইকেলে আসা তিন সন্দেহভাজন তাঁর বিএমডব্লিউ গাড়ির কাছে পৌঁছয়।
অভিযোগ, মোটরসাইকেল থেকে নেমে দুই ব্যক্তি গাড়িটি লক্ষ্য করে গুলি চালানোর চেষ্টা করে। তৃতীয় ব্যক্তি বাইক নিয়ে অপেক্ষা করছিল, যাতে হামলার পর দ্রুত এলাকা ছেড়ে পালানো যায়।
ঘটনায় টাইগারের গাড়ির চালক ফিরদৌস এবং ঘটনাস্থলের কাছে থাকা এক অটোরিকশাচালক আহত হন। অভিনেতা সরাসরি গুলিবিদ্ধ হননি। তবে গুলির বারুদের উত্তাপ এবং ভাঙা কাচের কারণে তাঁর শরীরে সামান্য আঘাত লাগার খবর পাওয়া গিয়েছে।
হামলার পর অভিনেতাকে চিকিৎসা ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়। ঘটনায় বলিউড মহলেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
হামলার পরপরই মুম্বই পুলিশ একাধিক তদন্তকারী দল গঠন করে। সিসিটিভি ফুটেজ, সন্দেহভাজনদের গতিবিধি এবং অন্যান্য তথ্যের ভিত্তিতে রাজস্থান পুলিশের সহযোগিতায় শুরু হয় তল্লাশি।
সোমবার সকালে রাজস্থানের কোটা থেকে তিন সন্দেহভাজনকে গ্রেফতার করা হয়। ধৃতদের মধ্যে রেহান এবং হৃতিক কুমার নামে দুজনের পরিচয় সামনে এসেছে। তৃতীয় ব্যক্তির বয়স ও পরিচয় সংক্রান্ত তথ্য নিয়েও বিভিন্ন প্রতিবেদনে অমিল রয়েছে।
পুলিশ সূত্রের দাবি, হামলার জন্য অভিযুক্তদের আগাম ৫০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছিল। তারা ট্রেনে চড়ে পালানোর চেষ্টা করছিল বলেও তদন্তে উঠে এসেছে। এমনকি নেপালে পৌঁছনোর পরিকল্পনা ছিল কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
হামলায় ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি আন্ধেরির কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে বলে খবর। তবে ব্যবহৃত আগ্নেয়াস্ত্রগুলির সন্ধান এবং হামলার নেপথ্যের নির্দেশদাতাদের শনাক্ত করাই এখন তদন্তের অন্যতম লক্ষ্য।
ঘটনার পর লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাংয়ের সঙ্গে যুক্ত বলে দাবি করা কয়েকজনের নাম সামনে আসে। অনিল পণ্ডিত এবং হরমন সান্ধুর নামে হামলার দায় স্বীকারের বার্তা ছড়িয়েছে সামাজিক মাধ্যমে।
ওই বার্তায় অভিনেতা সলমন খানের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের উদ্দেশেও হুমকির অভিযোগ উঠেছে। তবে সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত দাবি এবং হামলার প্রকৃত পরিকল্পনাকারীদের মধ্যে যোগসূত্র কতটা, তা পুলিশের তদন্তেই স্পষ্ট হবে।
সলমন খানকে ঘিরে বিষ্ণোই গোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে নতুন এই হামলা বলিউডের নিরাপত্তা নিয়ে ফের প্রশ্ন তুলেছে।
মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়ণবীশ হামলার নিন্দা করেছেন। রাজ্যের প্রশাসন অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেবে বলে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, উপমুখ্যমন্ত্রী একনাথ শিন্ডে অভিনেতার সঙ্গে দেখা করে তাঁর শারীরিক অবস্থার খোঁজ নেন। মুম্বইয়ে সংগঠিত অপরাধচক্রের দৌরাত্ম্য বরদাস্ত করা হবে না বলেও প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে।
এই ঘটনায় খুনের চেষ্টার অভিযোগ-সহ ভারতীয় ন্যায় সংহিতা এবং অস্ত্র আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় মামলা দায়ের হয়েছে। তদন্তের দায়িত্ব নিয়েছে মুম্বই ক্রাইম ব্রাঞ্চ।
এখন তদন্তকারীদের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—দ্বিতীয় হামলাকারীর বন্দুক কি সত্যিই মাঝপথে বিকল হয়ে গিয়েছিল, নাকি অন্য কোনও কারণে সে গুলি চালাতে পারেনি? উদ্ধার হওয়া কার্তুজের ফরেনসিক পরীক্ষা এবং অভিযুক্তদের জিজ্ঞাসাবাদেই এই রহস্যের সমাধান মিলতে পারে।
আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। * চিহ্নিত ঘরগুলো আবশ্যক