
নির্বাচন কমিশনকে ঘিরে দেশজুড়ে চলা রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যেই দিল্লির যুব আন্দোলনে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী ও প্রিয়ঙ্কা গান্ধী বঢরার সঙ্গে অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (AISA) সভানেত্রী নেহা বোরার উপস্থিতি এখন রাজনৈতিক আলোচনার অন্যতম বিষয়। প্রশ্ন উঠছে, তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা প্রতিবাদ আন্দোলনের সঙ্গে কংগ্রেসের সম্পর্ক কি আরও গভীর হচ্ছে? আর তেমনটা হলে ককরোচ জনতা পার্টি বা CJP-র স্বতন্ত্র রাজনৈতিক অবস্থান কোথায় দাঁড়াবে?
১২ অক্টোবর দিল্লিতে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে কংগ্রেসের সুপ্রিম কোর্ট অভিমুখী প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছিলেন নেহা বোরা। রাহুল এবং প্রিয়ঙ্কার সঙ্গে তাঁকে মিছিলের সামনের সারিতে দেখা যায়।
রাজনৈতিক মহলের নজর কাড়ে এই ছবিই। কারণ, নেহা কংগ্রেসের ছাত্র সংগঠনের নেত্রী নন। তিনি বামপন্থী ছাত্র সংগঠন AISA-র পরিচিত মুখ এবং সাম্প্রতিক একাধিক যুব আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত।
তাঁর উপস্থিতি কংগ্রেসের বৃহত্তর বিরোধী ঐক্যের প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা যেতে পারে। তবে এটি কোনও আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক জোট বা নেতৃত্ব পরিবর্তনের ইঙ্গিত কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
শিক্ষাব্যবস্থা, পরীক্ষায় অনিয়ম এবং নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে সাম্প্রতিক প্রতিবাদগুলিতে নেহা বোরা সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন।
বিশেষ করে CJP-র উদ্যোগে গড়ে ওঠা বিভিন্ন আন্দোলনে ছাত্র সংগঠনগুলির অংশগ্রহণ নতুন প্রজন্মের প্রতিবাদকে জাতীয় আলোচনায় নিয়ে এসেছে।
সেই আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত মুখ হিসেবে নেহার গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছে। ফলে জাতীয় স্তরের কোনও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে তাঁর উপস্থিতি স্বাভাবিকভাবেই বাড়তি গুরুত্ব পাচ্ছে।
অন্যদিকে, কংগ্রেসের কাছে এই ধরনের ছাত্রনেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ তরুণ প্রজন্মের রাজনৈতিক উদ্বেগ ও দাবিদাওয়ার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে।
অভিজিৎ দীপকের নেতৃত্বে ককরোচ জনতা পার্টি সাম্প্রতিক সময়ে একটি উল্লেখযোগ্য যুব প্রতিবাদী শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে।
নির্বাচনী তালিকা সংশোধন, গণতান্ত্রিক অধিকার এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদকে কেন্দ্র করে সংগঠনটি জনসমর্থন গড়ে তোলার চেষ্টা করছে।
কিন্তু কোনও আন্দোলনের সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত জাতীয় রাজনৈতিক দলের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হলে নেতৃত্ব এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রশ্ন সামনে আসতে পারে।
একদিকে জাতীয় দলের সাংগঠনিক পরিকাঠামো আন্দোলনকে বৃহত্তর পরিসরে পৌঁছে দিতে সাহায্য করতে পারে। অন্যদিকে, অপেক্ষাকৃত নতুন সংগঠনের নিজস্ব রাজনৈতিক পরিচয় আড়ালে চলে যাওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হতে পারে।
তবে রাহুল গান্ধী CJP-র আন্দোলনের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিচ্ছেন বা সংগঠনটির জনসমর্থন সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর মতো নিশ্চিত প্রমাণ এখনও সামনে আসেনি।
অক্টোবর মাসে দিল্লিতে নির্বাচন কমিশনবিরোধী কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে একাধিকবার পুলিশ ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
জন্তর মন্তর এবং কনট প্লেসের মতো এলাকায় প্রতিবাদ কর্মসূচি ঘিরে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। CJP এবং বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের সদস্যদের আটক করার ঘটনাও সামনে আসে।
১৬ অক্টোবরের ‘লহরা দো তিরঙ্গা’ কর্মসূচির আগে অভিজিৎ দীপক ও নেহা বোরাকে আটক করা হয়েছিল বলে খবর। পরে নেহা মুক্তি পান।
এদিকে CJP-র অন্য দুই নেতা সৌরভ দাস এবং আশুতোষ রাঙ্কার বিচারবিভাগীয় হেফাজতের মেয়াদ বাড়ানো হয়। ফলে সংগঠনটির সামনে প্রতিবাদ চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক সমন্বয়ের চ্যালেঞ্জও রয়েছে।
সাম্প্রতিক ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া নিয়ে বিরোধী দল এবং আন্দোলনকারী সংগঠনগুলি নানা প্রশ্ন তুলেছে।
তাদের অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ায় বহু বৈধ ভোটারের নাম বাদ পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিও এই বৃহত্তর প্রতিবাদের অংশ।
তবে নির্বাচন কমিশন অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। কমিশনের বক্তব্য, ভোটার তালিকা সংশোধন নির্ধারিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার অংশ এবং যোগ্য ভোটারদের নাম অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ রয়েছে।
এই মতপার্থক্যই বর্তমানে বিরোধী রাজনৈতিক দল ও যুব সংগঠনগুলির আন্দোলনের অন্যতম প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে।
নেহা বোরার সঙ্গে রাহুল গান্ধীর প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের ঘটনাটি শুধু CJP নয়, কংগ্রেসের নিজস্ব ছাত্র রাজনীতিতেও আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
কংগ্রেসের ছাত্র সংগঠন NSUI-র পরিবর্তে বামপন্থী ছাত্রনেতাদের বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
তবে এই ধরনের সহযোগিতা বিরোধী রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন মতাদর্শের ছাত্র সংগঠনের মধ্যে সমন্বয়ের একটি নতুন সম্ভাবনাও তৈরি করতে পারে।
দিল্লির সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে স্পষ্ট, নির্বাচনব্যবস্থার স্বচ্ছতা এবং গণতান্ত্রিক অধিকার নিয়ে যুব সমাজের একটি অংশ সক্রিয়ভাবে প্রতিবাদে অংশ নিচ্ছে।
তবে আন্দোলনের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে বিভিন্ন সংগঠনের নিজস্ব অবস্থান বজায় রাখা, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক কর্মসূচির ওপর।
রাহুল গান্ধী ও নেহা বোরার একই মিছিলে উপস্থিতি বিরোধী রাজনীতির নতুন সমীকরণের সম্ভাবনা সামনে এনেছে। কিন্তু কংগ্রেসের সঙ্গে সহযোগিতা CJP-র শক্তি বাড়াবে, নাকি তার স্বতন্ত্র পরিচয়কে চ্যালেঞ্জ জানাবে, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনও ভবিষ্যতের হাতে।
আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। * চিহ্নিত ঘরগুলো আবশ্যক