
কলকাতা থেকে বহু দূরে থেকেও দুর্গাপুজোর চেনা আবেগে মেতে উঠেছিলেন দিল্লি-এনসিআরের প্রবাসী বাঙালিরা। ঢাকের বাদ্যি, মায়ের আরাধনা, পুজোর ভোগ আর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে উৎসবের দিনগুলিতে জমজমাট হয়ে উঠেছিল নয়ডার সেক্টর ২৬ কালীবাড়ি। এবারের বিশেষ আকর্ষণ ছিল গ্রামবাংলার ঐতিহ্যকে কেন্দ্র করে তৈরি মণ্ডপসজ্জা।
নয়ডা বেঙ্গলি কালচারাল অ্যাসোসিয়েশন আয়োজিত এই দুর্গাপুজো ২০২৬ সালে ৪৪তম বর্ষে পা দিয়েছে। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে দিল্লি ও সংলগ্ন অঞ্চলে বসবাসকারী বাঙালিদের কাছে এই পুজো অন্যতম পরিচিত সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মিলনক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।
বড় শহরের আধুনিক পরিবেশের মাঝেই বাংলার গ্রামের সহজ-সরল জীবনযাত্রাকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন পুজো উদ্যোক্তারা।
মণ্ডপের নকশায় গুরুত্ব পেয়েছে মাটির বাড়ি, খড়ের ছাউনি এবং গ্রামীণ স্থাপত্যের পরিচিত বৈশিষ্ট্য। বাংলার চিরাচরিত কুঁড়েঘরের আদলে তৈরি এই পরিবেশ দর্শনার্থীদের কাছে অন্যরকম আকর্ষণ তৈরি করেছে।
শুধু বাহারি সাজসজ্জা নয়, এই ভাবনার পিছনে রয়েছে সাংস্কৃতিক পরিচয়কে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার উদ্দেশ্য।
যাঁরা বাংলার বাইরে বড় হয়েছেন কিংবা গ্রামবাংলার ঐতিহ্যের সঙ্গে সরাসরি পরিচিত নন, তাঁদের কাছে এই আয়োজন যেন নিজের শিকড়কে নতুন করে চেনার সুযোগ।
এবারের মণ্ডপ তৈরিতে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা শিল্পী ও কারিগররা অংশ নিয়েছেন।
বাংলার নিজস্ব নির্মাণশৈলী, লোকশিল্প এবং চিরাচরিত মণ্ডপসজ্জার উপাদান ব্যবহার করে তাঁরা নয়ডার পুজোয় আঞ্চলিক ঐতিহ্যকে ফুটিয়ে তুলেছেন।
মণ্ডপের পাশাপাশি প্রতিমার সাজেও গুরুত্ব পেয়েছে সাবেকিয়ানা। দেবী দুর্গাকে ঐতিহ্যবাহী ডাকের সাজে উপস্থাপন করার পরিকল্পনা করা হয়েছিল।
পুজো উদ্যোক্তাদের লক্ষ্য ছিল এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে প্রতিমা দর্শনের পাশাপাশি বাংলার শিল্প ও সংস্কৃতির সঙ্গেও পরিচিত হতে পারবেন দর্শনার্থীরা।
নয়ডার বাঙালি সমাজের দুর্গাপুজোর ইতিহাস বেশ পুরোনো।
১৯৮২ সালে নয়ডা বেঙ্গলি কালচারাল অ্যাসোসিয়েশন গড়ে ওঠে। এর পরের বছর, ১৯৮৩ সালের অক্টোবরে, সেক্টর ২৭-এর নয়ডা ক্লাবে প্রথম দুর্গাপুজোর আয়োজন করা হয়।
পরবর্তী সময়ে সংগঠনের কর্মকাণ্ড বিস্তৃত হয়। সেক্টর ২৬-এ কালীবাড়ি প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের স্থায়ী কেন্দ্র গড়ে ওঠে।
দুর্গাপুজোর পাশাপাশি সারা বছর নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উদ্যোগের মাধ্যমে স্থানীয় বাঙালি সমাজকে একত্রিত রাখার কাজ করে এই সংগঠন।
২০২৬ সালে ৪৪তম দুর্গাপুজো সেই দীর্ঘ যাত্রারই একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
দুর্গাপুজোর অন্যতম আকর্ষণ পুজোর ভোগ। নয়ডা কালীবাড়িতেও এই আয়োজনের গুরুত্ব বিশেষ।
পুজোর দিনগুলিতে বহু দর্শনার্থী ও ভক্ত ভোগ গ্রহণ করতে আসেন। পরিবারের সদস্য ও বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে একসঙ্গে বসে প্রসাদ খাওয়ার অভিজ্ঞতা উৎসবের আনন্দকে আরও বাড়িয়ে তোলে।
শুধু বাঙালিরাই নন, অন্যান্য ভাষাভাষী ও বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষও এই উৎসবে অংশ নেন।
পুজোর ভোগের পাশাপাশি বাঙালি খাবারের আয়োজন এবং বিভিন্ন খাবারের স্টলও দর্শনার্থীদের আকর্ষণের অন্যতম কেন্দ্র।
ফলে উৎসবটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানের গণ্ডি ছাড়িয়ে বৃহত্তর সামাজিক মিলনমেলার রূপ নেয়।
দুর্গাপুজোর দিনগুলিতে কালীবাড়ি প্রাঙ্গণে শুধু প্রতিমা দর্শন নয়, গান, নাচ এবং সাংস্কৃতিক পরিবেশনাও উৎসবের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ছোটদের অংশগ্রহণ থেকে শুরু করে বড়দের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান—বিভিন্ন বয়সের মানুষের জন্য থাকে নানা আয়োজন।
একদিকে চলে পুজোর আচার-অনুষ্ঠান, অন্যদিকে আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ।
বছরের অন্য সময়ে কর্মব্যস্ততার কারণে যাঁদের নিয়মিত দেখা হয় না, তাঁদের অনেকেই দুর্গাপুজো উপলক্ষে একত্রিত হন।
এই মিলনমেলাই প্রবাসের দুর্গোৎসবকে এক অনন্য সামাজিক পরিচয় দিয়েছে।
বড় আকারের সর্বজনীন পুজো পরিচালনার জন্য প্রয়োজন সুপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা।
প্রতিমা দর্শন, ভোগ বিতরণ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও দর্শনার্থীদের চলাচল—প্রতিটি ক্ষেত্রেই পুজো কমিটির সদস্য এবং স্বেচ্ছাসেবকদের দায়িত্ব থাকে।
বিশেষত উৎসবের ব্যস্ত দিনগুলিতে বিপুল সংখ্যক মানুষের উপস্থিতি সামলাতে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
এ ধরনের সর্বজনীন আয়োজনের সবচেয়ে বড় শক্তি হল স্থানীয় মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ। পেশাগত ব্যস্ততার মধ্যেও বহু মানুষ পুজোর প্রস্তুতি ও পরিচালনায় নিজেদের সময় দেন।
দিল্লি-এনসিআরের বাঙালিদের কাছে দুর্গাপুজো শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়। এটি ভাষা, সংস্কৃতি, স্মৃতি এবং সামাজিক সম্পর্ককে ধরে রাখার অন্যতম উপলক্ষ।
নয়ডার সেক্টর ২৬ কালীবাড়ির এবারের গ্রামীণ বাংলাভিত্তিক আয়োজন সেই আবেগকেই নতুনভাবে সামনে এনেছে।
শহরের বাইরে থেকেও যে নিজের সংস্কৃতি, শিকড় এবং উৎসবের পরিচয় আগলে রাখা যায়, নয়ডার দুর্গাপুজো তারই এক উজ্জ্বল উদাহরণ।
প্রজন্ম বদলাচ্ছে, বদলাচ্ছে শহরের চেহারা। কিন্তু পুজোর ক’টা দিন বাঙালির একসঙ্গে মেতে ওঠার আনন্দ আজও একই রকম রয়ে গেছে।
আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না। * চিহ্নিত ঘরগুলো আবশ্যক